নীল কোর্ট

রুদ্র খুব সাধারণ একটি ছেলে। সামান্য কেরানী পদের একটা চাকরী করে একটা সরকারী প্রতিষ্ঠানে। মাসে যা পায় তাতে খুব ভালো করে তার সংসার চলে যায়। সংসার বলতে আর কি ! মা আর সে। দিনশেষে কাজ থেকে সে যখন ঘরে ফেরে মা ছেলের জন্য অনেক দারূন দারুণ খাবার রেধে রাখেন। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। রুদ্র এলো বাসায়। মা দরজা খুলে একটা মিস্টি হাসি দিয়ে বললেন, সারাদিন কেমন গেলো বাবা? -ভালো। এ কথা বলে রুদ্র চলে গেলো। রুদ্র রাতের খাবার খেয়ে একটা বই পড়তে পড়তে ঘুমোতে যাবে তখন রূদ্রের আম্মু এলো।

-বাবা একটা কথা বলব।

-বল

– তোর বাবা মারা যাবার পর এখন সারাদিন বাসায় থাকি একা একা লাগে। আমি আর থাকবোই বা কতদিন। বয়স তো তোর কম হলোনা। পয়ত্রিশে পা দিয়েছিস। এবার একটা বিয়েথা করে সংসার শুরু কর।

রুদ্র বইটা খুলে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে একটু স্মিত হাসি দিয়ে বলল, মা এইতো সামান্য একটা চাকরি করি এই বেতনে আবার সংসারের স্বপ্ন দেখাটা ঠিক হয়না। তুমি যাও আমি প্রমোশন হলে ভেবে দেখব।

রুদ্রের মা কিছু আর না বলে চলে গেলেন। পরদিনের ঘটনা। রুদ্র একটা দোকানের সামনে দিয়ে হেটে বাসায় ফিরছিল তখন দোকানে চোখ পড়লো একটা কোর্ট উপর। দারূন একটা নীল রঙের কোর্ট। রুদ্র দেখতে যথেষ্ট হ্যান্ডসাম। সে ভাবলো সে এই কোর্টটা নেবে। যেই ভাবা সেই কাজ। সে দোকানে গিয়ে কোর্টটাদেখছে ঠিক তখনি একটা মেয়ে সেটায় হাত দিলো।

-এক্সকিউজ মি! -জ্বি। মেয়েটি বলল ,এই কোর্টটা আমি দেখছিলাম। মেয়েটি হেসে বলল, ও আচ্ছা আপনি দেখছেন। কিন্তু আমি এটা আগেই দেখে গিয়েছি এখন শুধু পে করতে এসেছি বুঝেছেন। -নাহ আমি বুঝিনি।

-কি বুঝেননি।

-দেখুন এটা আমি নিব। মেয়েটি আবারও হাসলো। হাসলে এই মেয়েটিকে পরীর মত লাগে। মেয়েটি কি এই কথাটা জানে। জানে বলেই হয়তো বেশি হাসে মনে মনে ভাবল রুদ্র।

-হাসছেন কেন!

-কারণ এটা আমি নিচ্ছি।

-না আমি ।একথা বলেই রুদ্র মেয়েটির হাত থেকে কোর্টটা নিয়ে নিলো। মেয়েটিও কম যায়না। সেও রুদ্রর হাত থেকে কোর্টটা কেড়ে নিলো। আমি নিব বলেছি মানে আমিই নিব।এবার তার চোখে একরাশ জেদ।

-দেখুন আপনি এটা আগে দেখে থাকলেও এখন আমি আগে এসেছি। একথা বলে তার হাত থেকে আবার কোর্টটা নিয়ে রুদ্র প্রাইসট্যাগ দেখলো, ১৫০০০ টাকা এটার দাম। ১৫০০০ টকা দিয়ে এই কোর্ট কিনে নিলে সারা মাস না খেয়ে থাকতে হবে। রুদ্র আর কথা বাড়ালোনা। মেয়েটির হাতে কোর্টটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, আপনিই নিন। মেয়েমানুষ বলে কথা। এবার মেয়েটি টিপ্পনী কেটে বলল, হ্যাহ! এখন তাই বলবেন। তারপর সে কোর্টটা নিয়ে চলে গেলো। তারপর দুদিন পরের কথা। এক বিকেলে রুদ্র হাটতে হাটতে পার্কে গেলো। বসার কোনো জায়গা খালি না পেয়ে সে হাটছে। এমন সময় সে দেখলো একটা বেঞ্চে বসে কোর্টের দোকানের সেদিনের সেই মেয়েটি কাদছে। কাদলেও যে মেয়েদের এত সুন্দর লাগতে পারে তা রুদ্রের জানা ছিলনা। কি অসম্ভব সুন্দর দেখতে মেয়েটি। কিন্তু সে কাদছে কেন? জানার জন্য রুদ্র এগিয়ে গেলো। মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল , কাদছেন কেন! -খুব আনন্দ লাগছে তাই কাদছি। অনেক মজা লাগছে তাই কাদছি। এগুলো বলেই আবার হাওমাও করে কাদছে মেয়েটি। রুদ্র প্রায় আধাঘন্টা ধরে মেয়েটির হাওমাও কান্না শোনার পর মেয়েটি থামলো। বলল, বসুন। রুদ্র বসল, এবার বলুন কাদছেন কেন! -আপনার মনে আছে আমি একটা নীল কোর্ট কিনেছিলাম।

-হ্যা -যারজন্য কিনেছিলাম আজ সে বিয়ে করছে।

-উনাকে কি নীলকোর্ট দিতে পারেননি? তাই কাদছেন?

-না দিয়েছি তো!

-তাহলে কাদছেন কেন!

-নীলকোর্টের জন্য কাদছি।

-কেন! মেয়েটি আবারো ফোপানো শুরু করলো, আপনি জানেন আমার কাছে পনেরো হাজার টাকার মূল্য কত বেশি। আমি ভেবেছিলাম আমি কোর্টটা আমার হবু স্বামীর জন্য কিনেছি। এবার সে ওই কোর্ট পরে হানিমুনে যাবে।

-হানিমুনে সাধারণত মানুষ বিচে যায়। সেখানে কোর্ট পরার প্রয়োজন হয়না।

-অই বেটা চুপ কর। আমি অন্য মেয়ের সাথে ওকে আমার টাকার নীলকোর্টে সইতে পারবোনা।

-ও আচ্ছা এই কথা

-হুম

-আচ্ছা তাহলে কোর্টটা চেয়ে নিন

-সেটাও পারবনা।

-তাহলে চুরি করে আনুন

-বাহঃ গুড আইডিয়া।আপনি আমাকে সাহায্য করবেন।

-নাহ নাহ

-নাহ আপনাকে আমাকে সাহায্য করতেই হবে নাহলে আমি এক্ষুনি কচুপাতা খাইয়ে আপনাকে মেরে ফেলব।

-বাপরে বাপ আপনি দেখি সাংঘাতিক মেয়ে।

-হুম -আচ্ছা সাহায্য করব।আচ্ছা আপনার নামটাই তো জানা হলোনা

– আমি নীলা।

-আমি রুদ্র

-রুদ্রনীলা…বলেই মেয়েটি হাসলো

(২) রুদ্র আর নীলা দাঁড়িয়ে আছে নিলয়ের বাসার নিচে। নিলয় নীলার প্রাক্তন। নীলা ভীষণ টেনশনে কাপছে আর এদিকে রুদ্র ক্রমাগত কথা বলে যাচ্ছে। সুনসান একটা গরিবী বাসা। একে আপনি এত দামী উপহার দিলেন কেন! হবুবর ভেবে। বুঝলাম। আচ্ছা দেখেছেন আপনার আর নিলয়ের নামের কত মিল! যেন ভাইবোন বলেই সে হাসলো। আপনার আর আমার নামও তো মিল! আপনাকেও ভাই ডাকব! নাহ থাক। নীলা দেখলো দেয়াল টপকে বাসায় ঢোকা যাবে। -রুদ্র! -জ্বি বলুন নীলা – আপনি দেয়াল টপকে উঠে যান। -মানে। -মানে মানে না করে দেয়াল টপকে উঠে গেইটটা খুলে দিন ভেতর থেকে -আমি কি পারব! -পারবেন যান রুদ্র নীলার কথা শুনে দেয়াল টপকে ওপাশে গিয়ে পড়ে পেলো কোমরে ব্যথা। সাধারণ বাসা তাই তেমন সিকিউরিটি নেই।ভেতর থেকে গেইট খুলে রুদ্র নীলাকে বাসায় ঢোকাতে যাবে তখন দেখলো নীলা বাসার ভেতরেই। -গেইট না খুলতেই কিভাবে আসছেন নীলা হাসলো। হেসে বলল, এভাবেই। রুদ্র কোমর ধরে বলল, কোমর আমার গেছে। নীলা আবারও হেসে বলল, ব্যপারটা দারুন। আচ্ছা চলুন এবার মিশন কমপ্লিট করি। আচ্ছে। এবার ওদের সামনে আরেক চ্যালেঞ্জ। ওরা দাঁড়িয়ে আছে দোতলা মূল ভবনের সামনে। নীলা রুদ্রকে দেখালো দরজা খোলা বারান্দা বিশিষ্ট রুমটাতেই নিলয় থাকে। ওখান দিয়ে যাওয়াই একমাত্র পথ।

-রুদ্র পেছনে গেইটের দিকে পা বাড়াচ্ছে আর বলছে এটা হবেনা।

-কে বলল হবেনা!

-আমি।

-কথা না বলে চুপচাপ দাড়ান আমি আসছি। একথা বলেই নীলা রুদ্রর পাশ থেকে হাওয়া হয়ে গেলো। রুদ্র ওকে দোতলায় বারান্দায় দেখতে পেলো।রুদ্র অবাক হয়ে বলল, আপনি ওখানে কিভাবে!

-এভাবেই

-কিভাবে! আ, আ , আ প, নি কি ভূত নাকি! নীলা হেসে বলল,হ্যা । রুদ্র সাথে সাথেই অজ্ঞান হয়ে গেলো।জ্ঞান ফেরার পর রুদ্র দেখলো সে বিছানায় শুয়ে আছে।দোতলায় চলে এসেছে সে। সে হুড়মুড় করে উঠে বসে চেয়ে দেখলো নীলা দাঁড়িয়ে আছে। উঠেছেন তাহলে! মরলেন কেন! -নীলা আমাকে বলবেন প্লিজ কি হচ্ছে!

-শুনুন তবে। তারপর নীলা সেদিনের ঘটনা বলতে শুরু করল। সেদিন আমি নিলয়ের জন্য সুন্দর কোর্টটা কিনে বাড়ি ফিরি।পরদিন ছিল আমার আর নিলয়ের এনিভার্সারি। দু বছর হয়েছে আমাদের বিয়ে হয়েছে। অসম্ভব ভালোবাসতাম ওকে। আমাদের মধ্যবিত্ত ফ্যামিলিতে এত দামী দামী জামাকাপড় কেনা সম্ভব হয়না। কদিন আগে আমি আর নিলয় শপিং এ গেলে কোর্টটা ওর পছন্দ হয় অনেক বেশি ওর চোখ দেখেই আমি বুঝেছিলাম। কিন্তু প্রাইসট্যাগ দেখে রেখে এসেছিল। আমি আমার সোনার গয়না বিক্রি করে দিয়ে যখন ওর জন্য এটা কিনতে গেলাম আপনার সাথে আমার ঝগড়া হয়। তারপর আপনিও সামর্থ্যের কাছে হেরে গিয়ে সেটা নিতে না পারায় আমি এটা নিয়ে আসি। বাসায় ফেরার পর দেখি আমার স্বামী বাসায় অন্য একটি মেয়ের সাথে পরকীয়া করছিল। আমার আকস্মিক প্রবেশ আর চেচামেচির এক পর্যায়ে সে আমার গলায় মোবাইলের চার্জার পেচিয়ে আমাকে মেরে ফেলে……… এই হলো আমার গল্প -তাহলে আপনার নিলয়ের বিয়ে! -সেটা ভুয়া গল্প। আপনাকে দেখে ভাবলাম এই নীল কোর্টটা আপনাকে দেয়া দরকার । এ কথা বলে নীলা নীল কোর্টটি এগিয়ে দিলো। রুদ্র হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো আর আপনার স্বামী! সে নেই…… হাহা বলে বাতাসে মিলিয়ে গেলো।

You may also like...