echo '' ;

এলোমেলো আর মাপা মন

________নিলুফা ইয়াসমিন

‘ভায়া কুইকলী একটা কেকের ছবি সেন্ড করনে!!!

-কিসের ছবি!!!!

-একটা তিনতালা কেকের ছবি।

-হু, খারা।

অতঃপর বন্ধুকে একটি তিনতালা কেকের পিকচার পাঠিয়ে পুনরায় গাছের তলায় বসে একটা রুপসী মেয়ের সাথে কথা বলা শুরু করে দিলো সাদ।কথা বলা বলতে চ্যাটিংয়ে ব্যস্ত। লুতুপুতু চ্যাটিং চলছে মোটামোটি।

কথাগুলো এমন  তুমি চাইলে দিবারাত্রি সমস্ত কাজ ফেলে আমি তোমাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকব। তোমার চুলের ডগা নিয়ে খেলা করব।  

সাদের আকাঙ্ক্ষা এই চ্যাটিংগুলা রিদির চোখে পড়ুক আর ও তেলে বেগুনে রবি সিমের দুর্দান্ত গতির ন্যায় জ্বলেউঠে ফোন দিয়ে ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে গালিগালাজ করুক। একঘন্টা হয়ে গেছে তা এখনো হচ্ছেনা।মনে হচ্ছে যেন ভুলভাবে মাছ ভাজার চেস্টা করছে সাদ।

-দোস্ত, দোস্ত!!!

-হুম বল….

-ভাবী তো সেই খুশি হইছে।

-কোন ভাবী!!!তোর ভাইয়ের বিয়ে হলো কবে!!

-দুরুজা!! আমি তোর বউয়ের কথা কইতাছি।ভাবীরে মাত্র বার্থডে উইশ করলাম না!!!ভাবী খুশি হয়ে একটা কিসিং ইমো দিছে

-আর তুই!!

-আমিও দিয়া দিছি

সাদ এবার বুঝতে পারলো রিদি আসলে মেসেজগুলা চেক করেছে।হায় আল্লাহ!এদিকে আবার ওর বার্থডের ডেটটাও ভুলে গেছে সাদ।কি হবে এবার রিদিতা পাক্কা ব্রেকাপের হুমকি দিবে।নাহ কিছু একটা করতে হবে!!!

লাফ দিয়ে উঠে দাড়ীয়ে পকেটে হাত দিয়ে দেখে সাদ পকেটের কোনায়  একটা নোট আছে।হাসি হাসি মুখ করে নোটটা বের করে দেখে সাদ এটা পুরাকালের প্রাগৈতিহাসিক কালের পাঁচ টাকার নোট। দূর ছাই!!!সাদ ফোনে রিমাইন্ডার সেট করে রেখেছিল ওর ডেট মনে থাকেনা বলে।কখন রিমাইন্ডার এসে ফাকি দিয়ে হেসে চলে গেছে সাদের খেয়ালই নাই।ভেবেছিল দিনটা ওর কাছে স্পেশাল করে দিবে। গ্র‍্যান্ড একটা রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাবে ওকে।সব গেলো।

-দোস্ত!!! তুই কি আমার বউয়ের সাথে এখন কথা বলছিস।

-হ্যা।

-লুতুপুতু খেলিস না।

সাদ উঠে এলো ওখান থেকে। ঘড়িতে প্রায় দশটা বাজে।এখন তো রিদি কলেজ ক্যাম্পাসেই আছে। দুপুরের আগে ওর সামনে উপস্থিত হতে হবে..

(২) মা আজকে অবাক হয়ে গেছেন। ছেলে বাড়িতে চলে এসেছে বেরোনোর কিছুক্ষন পরেই।ওনি কিচেনে রান্না করছিলেন। রিদির জন্য পায়েস রান্না করছেন।মেয়েটাকে খুব ভালোবাসেন তিনি।সাদ ধীরে ধীরে কিচেনে বিড়ালের মত হেটে এসে মায়ের আচলে আলতো করে ধরল।মা মিটিমিটি হাসলেন।

কি চাই??

টাকা!!!

টাকা কেন!!!

মা রিদির জন্মদিন আজকে ওকে কিছু সারপ্রাইজ দিতে হবেনা..গিফট দিতে হবেনা!!!নাহলে বলোতো কেমন অভিমান করে বসে বসে কাদবে মেয়েটা।সাদ মুখ ছোট করে চেহারায় তুমুল কস্টের ছাপ এনে টেনে টেনে কথাগুলো বলছে।মা আচল সরিয়ে নিয়ে পায়েস নামাতে নামাতে বলল,  বাবার কাছে চেয়ে নে…..আমার কাছে অভারএক্টিং করিস না।

আম্মু তুমি কি বলো আমি এক্টিং করলাম কই!!আর আব্বুকে আমি এখন গিয়ে ক্যাম্নে বলি আব্বু টাকা দাও।আমার হবুবউয়ের বার্থডে পালন করব। কেমন দেখায়না!!!!তাছাড়া I have লজ্জা…….বলেই লাজুক ভঙিতে মায়ের আচল ধরে মুখা লুকিয়ে গ্রাম্য মহিলাদের ন্যায় মুখ টিপে হাসতে শুরু করলো।

আচ্ছা, যা, খেতে বস গিয়ে আমি দেখছি।

সাদ গপাগপ টপাটপ খাবারগুলো গিলে নিয়ে ঢেকুর তুললো।তারপরই চেচাতে শুরু করে দিলো।

মা, মা!!!!দৌড়ে আসো।

মা রান্নাঘর থেকে এসে দাড়ালেন।টেবিলে একটা শপিং ব্যাগ আর একটা বড় বাক্স রেখে বলল,  বাক্সে কেক আছে।আমি বানিয়েছি সকালে আমার বৌমার জন্য।শপিং ব্যাগে ওর জন্য পায়েল আছে। পরিয়ে দিস

মা!তুমি জানলে কি করে!!! অবাক হয়ে সাদ বলল।কারন সে রিদিকে বার্থডেতে পায়েল গিফট করার কথাই ভেবে রেখেছিল।

মা হাসতে হাসতে বলল, আমার বোকা ছেলেটা যদি  মোবাইলে রিমাইন্ডার দিয়ে রেখে ভুলে যায় আর ডায়েরী লিখে যেখানে সেখানে ফেলে রাখে সবাই ই জানতে পারবে!!!!

সাদ ভ্রু কুচকে ডেভিলস্বরে বলল, মা এটা কিন্তু ভালোনা!!! অন্যের ডায়েরী পড়া তারপর ইষৎ হেসে বলল , তবে মাঝে মাঝে পড়ে এভাবে সব রেডি রেখো

সাদ বাড়ি থেকে বেরোবার আগে ওকে ওর মা কিছু টাকাও দিলো।এলোমেলো চিন্তার পাগল ছেলেটা কি যে করে কে জানে!!ছেলের পাগলামির কিছু শৈশবস্মৃতি মনে করতে করতে মা রান্নাঘরে চলে গেলো পায়েসটা এখনো শেষ হয়নি।

(৩)সদ্য জল থেকে উঠানো কৈ মাছের ন্যায় রিদিতা ভিতরে ভিততে তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে সেটা বুঝতে বাকি নেই সাদের।তবে বাইরে রিদি কিছুই বলছেনা।একদম শান্ত হয়ে মিষ্টি হেসে সাদের দিকে তাকিয়ে আছে। বারবার চোখ দিয়ে রিদি বোঝার চেস্টা করছে সাদ ওর বার্থডে মনে রেখেছে কিনা!!!হাতে যেন একগুচ্ছ গোলাপ খুজছে সে।সাদ সেদিকে নজর না দিয়ে বার্থডেটা ভোলারই ভান করল।যদিও রিদিতা মুখটা ধীরে ধীরে ঘোমড়া করে ফেলেছে, সে তবুও ওকে আরো রাগিয়ে দেবার জন্য মিটিমিটি হাসছে আর বলছে, জানো আজকে ফেবুতে এক রুপসী ললনা আমাকে প্রপোজ করেছে।

সত্যি!!!!

হু

তোমার মত ছেলেকেও মেয়েরা পছন্দ করতে শুরু করেছে!!!

Yes,I am proud

আমার ক্লাস আছে। আমি যাচ্ছি।

যেওনা সাথী,ও ও ও ও………….

কি হয়েছে গান গাচ্ছো কেন!!!

আজ আমাদের শেষ দেখা।

মানে!!!!!!!

মানে হচ্ছে আজকের পর হয়তো দেখা হবেনা।

কেন????

কারন,তুমি আমাকে একটুও ভালোবাসোনা।

ভালোবাসা তোর  আমি বাইর করব।ভালোবাসিনা আমি!!!!!রিদি শর্ট টেম্পার্ড।তারপরও এতক্ষন চুপচাপ ছিল সেটাই অনেক বেশি ছিল।কিন্তু হুট করে যেন বাধ আর জল সামলাতে পারলোনা তাই সব বেরিয়ে এলো।কিন্তু সাদও আজ পাক্কা লেভেলের খেলোয়াড় হয়েই মাঠে নেমেছে।

বাসোই না তো। এই যে চেচিয়ে উঠলে আমার উপরে।।

রিদি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো।তৎক্ষণাৎ ওর রাগ পড়ে গেলো। ‘ কি হয়েছে সাদ!! তুমি কি ডিস্টার্বড আমাকে নিয়ে??’

সাদ নিজেকেই নিজে মনের ঘরে চোখ টিপ দিয়ে বাহাবা দিলো।প্রথমবারেই ছক্কা ‘ এত কথা বাড়িয়োনা রিদি। আমার সাথে এসো। অনেক প্রয়োজনীয় কথা আছে তোমার সাথে।’বেশ একটা সিরিয়াস ভাব চলে এসেছে ওর মুখে।সাদ জানে রিদি যতই রাগী হোকনা কেন সাদের জন্য ওর মন তার চেয়েও বেশি ব্যাকুল।

রিদির মুখটা শুকিয়ে আছে সকাল থেকে। তার উপর সাদের ঝাড়ি খেয়ে বেচারী আরো মুখ ঘোমড়া করে সাদের বাইকের পেছন উঠে বসল।সাদ বসে হাসছে। রিদি তো আর জানেনা ওর জন্য কি সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে।

(৪)আমাকে দাড় করিয়ে রেখে কোথায় চলে গিয়েছিলে!রিদির চোখেমুখে ভীতির ছাপ স্পষ্ট।

কোথাও যাইনি

তাহলে কি করছিলে!!

আচ্ছা আর কথা বলোনা এবার ভালো মেয়ের মত চোখদূটি বন্ধ করো দেখি।

কেন!!!!

আমি বলছি বন্ধ করো।

রিদি চোখ বুজলো। অপুর্ব সুন্দর ওর মুখের গড়ন। প্রতিমাদেবীর মতন। গায়ের রঙটা খুব বেশি উজ্জল নয় কিন্তু সাদের নিকট শ্যামলা এই মেয়েটিকে সবচেয়ে সুন্দরী মনে হয়।সাদ ওরদিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। চোখ বন্ধ করে নিলে এতটা নিস্পাপ মুখ লাগে কারো জানা ছিলনা ওর।

অই তুমি কোথায়??রিদি হাত বাড়িয়ে ওকে ধরতে গেলো। সাদকে ছুতে পারার আগেই সাদ ওর থেকে দূরে সরে গিয়ে বলল পারবেনা!!

রিদি একচোখ খুলে নিয়ে ওকে দেখতে গেলে সাদ ওকে বাধা দেয়।না, এটা হবেনা এটা প্রতারনা

রিদিতা খিলখিল করে বাতাসে হেসে উঠে।আর তুমি কি করছো মশাই!!!

আমি যা করি সব ঠিক

সব ঠিক, হুম।

যাইহোক আমার হাত ধরে হাটো দেখি।সাদের হাত ধরে হাটতে হাটতে কোথায় যাচ্ছে রিদির জানা নেই….

কিন্তু সে জানে যখন চোখ খুলবে তার সামনে অপেক্ষা করছে সুন্দর কিছু মূহুর্ত।তাই হল, রিদি চোখ খোলার এমন কিছু তার সামনে দেখতে পেলো যা ওর নিহারিকা মনে স্পর্শ করে চলে গেলো।রিদি কেবল অবাকচোখে তাকিয়ে আছে। অসংখ্যা ফুটন্ত গোলাপ ওকে ভালোবেসে যেন ছুয়ে দিতে বলছে।রিদি অবাক চোখে ফুলের কলিগুলোর হাসি দেখে যাচ্ছে।অসংখ্য গোলাপের ভিড় এখানে।সবাই লুকোচুরি করে দেখছে রিদিকে।রিদি সাদের দিকে তাকিয়ে ওকে বলল একটা চিমটি কাটোতো….

সাদ হেসে বলল, চিমটি কাটার কিছু নেই। তুমি বাস্তবেই অসংখ্য গোলাপের বাগানে দাঁড়িয়ে আছো।এত গোলাপ কখনো একসাথে দেখেছো বলো!এই সব গোলাপ তোমাকে তোমার জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাবে বলে আমার কাছে খুব বায়না করেছিলো। তাই নিয়ে এসেছি তোমাকে। আর ওদের সবার সাথে এই তোমার পাজিটাও তোমাকে জানাচ্ছে জন্মদিনের শুভেচ্ছা। একগাদা গোলাপ নিয়ে হাটুগেড়ে বসে ফুলগুলো ওর দিকে বাড়িয়ে দিলো সাদ।

রিদি ফুলগুলো হাতে নিলো।আর কিছু বলবেনা।

হুম বলবো তো। তোমার পা টা দেখাবে??

কেন!!পায়ে কি???

আহা!!পা টা কি দেখানো যায়।আমার হাটু গেড়ে বসা পায়ের উপর ম্যাডামের পা টা কি রাখা যায়ন!!!

না।

কেন!!

এমনি।

এইযে, তুমি না!!আমাকে একটুও ভালবাসোনা।

রিদি হাসলো।আচ্ছা রাখছি পা।

রিদিতা পা টা রাখলে সাদ পকেট থেকে পায়েলটা বের করে রিদির পায়ে পড়িয়ে দিলো।সোনালী পায়েলটা চমৎকার দেখাচ্ছে রিদির সুন্দর পায়ে।সাদ ওর পায়ে আঙূল কলমার্থে ব্যবহার করে ভালোবাসি লিখলো অদৃশ্য প্র‍্যিলিপিতে।

রিদি যদিও বুঝতে পারলো তবুও খিলখিল করে হেসে বলল “পায়ে কাতুকুতু দিচ্ছো কেন!!”

রিদি পা সরিয়ে নিলো।অতঃপর হাজারো গোলাপের বাগানে রিদির জন্মদিন স্মরনীয় করে বাইকে চড়ে ফিরে আসছিলো ওরা। রিদিতা এখন বড্ড বেশি খুশি।কেবলি হাসছে।সাদের পিঠে মাথা এলিয়ে দিয়ে বারবার সুখী অনুভুতিটা প্রকাশ করছে সে।এমন সময় সাদের পকেটে ফোন বেজে উঠলো।ফোনটা উঠালো সাদ।

মা, ফোন করেছিলেন।বললেন তোমার জন্য পায়েসে করেছে।বাসায় যেতে বলল।

হুম যাব রিদি বলল।

(৫)আজ আট বছর পর

সাতাশ মে। রিদির জন্মদিন।রিদি কিচেনে রকমারী খাবার রান্না করতে ব্যস্ত। কোলে চার বছরের একটা মেয়ে।পাশে মায়ের আচল ধরে ছয় বছর বয়সী ছেলেটি ঝুলে আছে।সাদ দূর থেকে দেখে ভাবছে রিদির শাড়িটা এই ছেলের ঝুলে থাকার ভরে খুলে না গেলেই হয়।সে সময়টাতে পাশে থাকতে চায় রিদির কিন্তু অফিসের ব্যস্ততায় কিচেনে একবার উকি দিয়ে চলে যেতে হয় রোজ।আজও তাই। এসেছিলো কেবল দুপিচ পাউরুটি নিতে।

পাউরুটি মুখে গুজে বাচ্চা দুটির কপালে চুমু একে দিয়ে সাদ রিদির দিকে তাকায়।কিন্তু রিদি খুব ব্যস্ত।ব্যস্ত চোখে একবার কেবল বলে ‘শোনোনা!!’

সাদ তাকায় ওর দিকে।এই বুঝি রিদিও চেয়ে বসে একটা চুমু।না তা চায়না রিদি। সে বলে “শোনোনা!!! আসার সময় বাবুদের জন্য ডায়াপার এনো।”

সাদ বেরিয়ে আসে।ব্যস্ততায় রিদিকে বার্থডে উইশ করতেও ভুলে যায়।সারাদিন করি করি ভেবেও মাপা মাপা মনটা ব্যর্থ হয়।

রাত্রিরে রিদি আর সাদ দুজনই শুয়ে একে অপরকে নিজেদের কুশলী জিজ্ঞেস করে ওপাশ ফিরে ঘুমিয়ে যায়।আসলেই কি ঘুমিয়ে গেছে তারা!!!

নাহ, দুজনই আজ হঠাৎ বুঝতে পারে তাদের ভালবাসা আজ কত মাপা মাপা।একসময়ের সেই এলোমেলো মনের ভালোবাসাই যেন সুখের সন্ধান এনে দিয়েছিলো।আজ অসুখী নয় ওরা তবুও ভালোবাসা বদলে গেছে………..

You may also like...